ঢাকায় অটো ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যক্রম আপাতত স্থগিত

পটুয়াখালী ওয়েব রিপোর্ট॥

যানজট ও জনভোগান্তি বেড়ে যাওয়ায় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যক্রম আপাতত স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানীর কোন রুটে কত সময় লাল, হলুদ ও সবুজ বাতি জ্বলবে, সেটা নির্ধারণসহ সার্বিক বিষয়টি পর্যালোচনার পরই স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএমপি ও দুই ঢাকা সিটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুক্রবার থেকে রাজধানীর শাহবাগ থেকে কাকলী পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতি চালু করা হয়। শুক্রবার কোনও সমস্যা না হলেও শনিবার বিকাল থেকে রাজধানীতে যানজট অসহনীয় হয়ে ওঠে। রবিবারও রাজধানীতে সারাদিন তীব্র যানজট ছিল। সোমবার সকাল না হতেই পুরো রাজধানী তীব্র যানজটে অনেকটা অচল হয়ে পড়ে। ফলে সিটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। বৈঠক শেষে ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়ার নির্দেশে সকাল সোয়া নয়টা থেকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বাদ দিয়ে ম্যানুয়েল পদ্ধতি অর্থাৎ ট্রাফিক পুলিশ হাতের ইশারাতেই ট্রাফিকিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এরপরও যানজট সহনীয় পর্যায়ে নিতে তাদের দুপুর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। দুপুর ২টার পর থেকে যানজট কিছুটা কমতে শুরু করে।

ডিএমপি সূত্র জানায়, কয়েকদিন আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। এ সময় তারা ঢাকা মহানগরের যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সড়ক, ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করা, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির পর আবার মেরামত না করে নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রেখে জনভোগান্তি সৃষ্টি, মূল সড়কে গাড়ি পার্কিংসহ যেখানে-সেখানে বাস থামানো নিয়ে আলোচনা করেন।

যেসব কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিরসনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেন তারা। সিদ্ধান্তগুলো ছিল- শাহবাগ থেকে কাকলী পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল পরীক্ষামূলকভাবে চালু। মতিঝিল এলাকার সড়কে কার পার্কিং বন্ধ ও সিটি সেন্টারে কার পার্কিং ব্যবহার নিশ্চিত করা। দখল হয়ে যাওয়া সড়ক ও ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ ও দখলমুক্ত করা। যেখানে-সেখানে বাস স্টপেজের কারণে সৃষ্ট যানজট নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত শুক্রবার থেকে শাহবাগ থেকে কাকলী সিগন্যাল পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক পদ্ধতি চালু করে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। কেস বা ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট প্রকল্পের অধীনে দুই সিটি করপোরেশন ও ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে এই কার্যক্রম শুরু করেছিল।

কিন্তু এ পদ্ধতিতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে রাজধানীর পুরো ট্রাফিকিং ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছিল। তীব্র যানজটে গোটা রাজধানী হয়ে পড়ে স্থবির। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে সোমবার সকাল থেকেই প্রচণ্ড যানজট দেখা দেয়। ভিআইপি সড়কেও ছিল একই চিত্র। যানজটের কবলে পড়ে রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন যাত্রী ও চালকরা। যানবাহন ছেড়ে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে অফিসে যান অনেকেই।

ট্রাফিক বিভাগ সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্টের আওতায় ২০০৫ সালে রাজধানীর ৫৯টি সড়কের বিভিন্ন মোড়ে ৬৯টি স্বয়ংক্রিয় অটো সিগন্যাল লাইটপোস্ট স্থাপনের কাজ শুরু করে। এ সিগন্যাল প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শেষ হয় ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে। পিক-অফপিক সময় বিবেচনা করে বিভিন্ন রুটের ট্রাফিক সিগন্যালের সময়সূচিও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। সকাল, দুপুর ও বিকেলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যানবাহনের চাপের ওপর নির্ভর করে ট্রাফিক সিগন্যালের সময় নির্ধারণ করা হয়। বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয়ে নতুন এ পদ্ধতি চালু এবং পরিবহণ চালক ও পথাচারীদের সচেতন করতে বিগত বছরগুলোয় কয়েক দফা বিশেষ প্রচারণাও চালানো হয়। আইন অমান্যকারী চালকদের জরিমানা, তিন মাসের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত ও নকল লাইসেন্সধারী চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে নামানো হয় কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা চালুর অংশ হিসেবে মোবাইল ফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মধ্যে ‘ই-ট্রাফিক’ সেবারও চুক্তি করা হয়েছিল। কিন্তু ওই উদ্যোগও ফলপ্রসূ হয়নি।  

রাজধানীর নিত্য যানজট নিয়ন্ত্রণে ২০০৯ সালের শেষের দিকে এবং ২০১২ সালের জানুয়ারিতে দুদফা আনুষ্ঠানিকভাবে মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ অটোমোটেড ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করে। ক’দিন পরই আবার সেটা তাদের পক্ষেই মানা সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্টদের মতে, ছুটির দিন কিংবা কার্যদিবস নয়, ট্রাফিক আইন অমান্যসহ নানা কারণে সপ্তাহের প্রায়দিনই সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রাজধানীতে যানজট লেগেই থাকে। নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া যানজট ও যানবাহনের অব্যাহত চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণেই বাধ্য হয়ে ট্রাফিক পুলিশ স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারছেন না। মহানগরীর যানজট নিয়ন্ত্রণে বাঁশ ও দড়ি পদ্ধতি চালু করেও যানজট নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি ট্রাফিক পুলিশ। এসব নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের গলদঘর্ম অবস্থা। তাছাড়া কোন রুটে কত সময় লাল, হলুদ ও সবুজ বাতি জ্বলবে সেটাও নতুন করে সমন্বয় করতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে রাজধানীতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে স্বীকার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এর আগেও এ পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুক্রবার থেকে আবার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। প্রথম দিন ভালোয়-ভালোয় কাটলেও পরদিন শনিবার বিকেল থেকে শুরু হয় তীব্র যানজট। ফলে বাধ্য হয়েই তারা আবার ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ সমস্যার সমাধান  কিভাবে সম্ভব, এ নিয়ে আবারও ডিএমপি ও সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে বসবেন বলে জানান তিনি। সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান না করা পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি আর চালাবেননা তারা।

পটুয়াখালী ওয়েব/২০১৫/অপ

তারিখ : ২০১৫-০৫-১৮ সময় : ১১:৪৬:৪৮ বিভাগ: জাতীয়