ছয়’বছর পার হলেও সিডরে ক্ষতিগ্রস্তরা এখনও মানবেতর জীবন-যাপন করছে

পটুয়াখালী ওয়েব রিপোর্ট॥

 ছয়’বছর পার হলেও সিডরে ক্ষতিগ্রস্তরা এখনও মানবেতর জীবন-যাপন করছে। গতকাল সকালে মির্জাগঞ্জ উপজেলার মেন্দিয়াবাদ গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এই চিত্র। আজ ভয়াল ১৫ নভেম্বর। এ দিন রাতে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে মির্জাগঞ্জ উপজেলার জনজীবন লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ১১৫ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর প্রাণহানীসহ অনেক সম্পদের ক্ষতি হয়। সিডরের ছয়’বছর পেরিয়ে গেলেও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি মির্জাগঞ্জ উপজেলার সিডর ক্ষতিগ্রস্তদের। তারা এখন অবেহেলিত, বাঞ্চিত, অনেকেই মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কেউ ঢাকায় গেছে কাজের সন্ধানে, কেউ নদীতে মাছ ধরে, অন্যের সঙ্গে কাজ করে এখন তাদের পরিবার পরিজনের জন্য দু’ মুঠো খবার সংগ্রহ করতে হয়। কান্না জড়িত কন্ঠে এ কথাগুলো বলেন মেন্দিয়াবাদ গ্রামের শাহজান হাওলাদার। পায়রা নদী থেকে ৪০ ফুট দুরে ছিল তার ঘর। সিডরের পর দিন ঘরের একটি খুটিও খুঁজে পায়নি সে। নব-নির্মত বেড়িঁবাধের বাইরে তার জমি থাকায় ত্রানের ঘর পায়নি বলে সে জানান।

এ রকম অনেক পরিবার রয়েছে এই গ্রামে। অনেকে এখনও বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি বানিয়ে দেয়া হবে এ আশায় বুক বেধেঁ কেউ কেউ পায়রা নদীর বেড়ি বাঁধের ঢালে ছাপড়ার নিচে খুপড়ি ঘরে বসবাস করছে। স্বজন হারা ব্যাথা নিয়ে কাটছে তাদের জীবন। একই ভাবে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে শত শত পরিবার সবর্শ্ব হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। কেমন আছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা এ তথ্য সংগ্রহ করতে উপজেলার দক্ষিনে পায়রা নদীর তীরে মেন্দিয়াবাদ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তাদের মানবেতর জীবন-যাপনের করুন চিত্র । বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সহ অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তিত্ব এসব দূর্গত মানুষের পাশে দাড়ানোর ফলে অনেকেই ঘূরে দাড়িয়েছে। ফিরে পেয়েছে মাথা গোঁজার মত ঠাঁই। অনেকেই শুরু করেছে নতুন করে বাঁচার লড়াই, কেউ ফিরে গেছে তার চাষাবাদের কাজে, কেউ ফিরেছে মাছ ধরার বা দিনমজুরের কাজে।

আবার অনেকেই এখনও খুজে পাইনি মাথা গোঁজার ঠাঁই। কেউবা এনজিওর দেয়া অনুদানের ঘর তুলেছে, আবার ঘর না পেয়েও অনেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। স্বামী পরিত্যাক্তা ফাতেমা বেগম বলেন, বেড়ি বাঁধের ভেতরে নিজেদের জায়গা না থাকায় অনেককে ঘর দেওয়া হয়নি। গত ছয় বছর ধরে তারা এ বাধেঁর ঢালে রোধ-বৃষ্টিতে ভিজে বসবাস করছেন। সিডর ও আইলায় মোগো সব শ্যাষ। তার পরে আবার মহাসেনে আঘাতে ক্ষতিহয়েছে। পোলা-পান লইয়া মোরা এহন বাঁধের ঢালে রাইত কাটাতে হয়। সরকারী হিসাব মতে, এ উপজেলায় সিডরের আঘাতে ১০ হাজার ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। এর মধ্যে বাছাই করে ৫ হাজার ২০ পরিবারকে সরকারি ভাবে দেওয়া হয় ঘর প্রতি ৫ হাজার টাকা।

আংশিক বিধ্বস্ত হয় ১৪হাজার ৫শত ঘর, গবাদিপশু মারা যায় ২ হাজার ৫শত, হাঁস-মুরগি মারা যায় ১লাখ ৩০ হাজার, ফসল বিনষ্ট হয় ১১ হাজার ৯৯০ একর জমির,৭ হাজার ৯৮৭ টি পুকুরের প্রায় কোটি টাকার মাছ ভেসে যায়, এছাড়াও উপজেলার ৮০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ২৪০টি মসজিদ সম্পূর্ন বিধ্বস্ত হয়, ৩৪ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১৫৬ কিলোমিটার কাচাঁ সড়ক ও ৩৫ কিলোমিটার বাধঁ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে সৌদি সরকারের অর্থায়নে ১৩০০ ও জাপান সরকারর অর্থায়নে আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যয়ে ২০০ পরিবার,ব্র্যাক হাউজের মাধ্যমে ২১৫,জলবায়ু ট্রাস্ট ৫০টি ঘর, এবং বিভিন্ন এনজিওর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১৪৬২টি ঘর নির্মান করে দেওয়া হয়। এখন উপজেলায় ১ হাজার ৯৩ টি ঘর নির্মান প্রয়োজন।

উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নে বিধ্বস্ত হয় ১ হাজার ১৭০টি ঘর। মৃত্যু ঘটে ৮৫ জনের। এর মধ্যে চরখালী গ্রামে মারা যায় ৪৫ জন। চরখালী সমবায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. গোলমা মোস্তফা বলেন, সে সময় চরখালী গ্রামে কোন জমি ছিলনা, সব জমি ছিল জলমগ্ন। তাই আমাদের বাড়ির পুকুরের পাড় উচুঁ থাকায় সিড়রে মারা যাওয়া লাস গুলো এখানে কবর দেওয়া হয়। পরে চরখালী গ্রামের খান বাড়ির পুকুর পারে ২৪টি কবরে ৩৩টি লাশ দাফন করা হয়। গনকরটি এখন অযতœ-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। কেউ তাদের খোঁজ রাখে না। এমনকি সরকারি ভাবে তাদের স্বরনে কোন দোয়া অনুষ্টান হয় না।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো.জয়নুল আবেদীন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের পূনর্বসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্র্যাক জাপানী হাউজ নির্মানেরর ব্যবস্থা করার কাজ চলছে। যারা এখন পর্যন্ত ঘর পায়নি তাদেরকে পর্যায়ক্রমে পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। কারন এটি চলমান প্রক্রিয়া।

পটুয়াখালী ওয়েব/২০১৫/অপ

তারিখ : ২০১৫-০১-১৬ সময় : ১৫:০৩:৫৪ বিভাগ: মির্জাগঞ্জ